০ কোটি টাকার জালনোট উদ্ধার; ০ প্রস্তুতি ছিল রোজা ও ঈদের বাজারে ছাড়ার
০ পুলিশের আশঙ্কা বেশকিছু জাল টাকা ইতোমধ্যে বাজারে চলে গেছে

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রাজধানীতে জাল টাকার ‘টাকশাল’ আবিষ্কৃত হয়েছে। এখান থেকে কোটি টাকার জাল নোটসহ ৬ জাল মুদ্রা কারবারিকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। উদ্ধারকৃত জাল টাকাগুলো রমজান ও ঈদের বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি চলছিল। ইতোমধ্যেই বেশ কিছু জাল টাকা বাজারে চলে গেছে।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মশিউর রহমানের নেতৃত্বে একটি দল অভিযানে নামে। তারা প্রথমেই অভিযান চালায় মুগদা থানাধীন দক্ষিণ মুগদার ওয়াপদা গলির ১/৮/খ/২ বাড়ির দ্বিতীয় তলায়। এরপর পর্যায়ক্রমে রাজধানীর মতিঝিল ও মিরপুর এলাকায় অভিযান চলে। অভিযান চলে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত। অভিযানে এক কোটি টাকার জাল নোট ও জাল নোট তৈরির ল্যাপটপ, প্রিন্টার ও জাল টাকা তৈরির বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতার করা হয় সেলিম (৩০), জালাল উদ্দিন (৪৫), আবিদ (৪২), শহিদুল ইসলাম (৩০), তার স্ত্রী মরিয়ম বেগম (২০) ও রোজিনা বেগমকে (৩০)।
শুক্রবার দুপুরে জাল নোটসহ গ্রেফতারকৃতদের ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া এন্ড কমিউনিটি সেন্টারের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমানসহ উর্ধতন পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। গোয়েন্দা কর্মকর্তা মশিউর রহমান সাংবাদিকদের জানান, সেলিম গার্মেন্টসের স্টক লটের ব্যবসায়ী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে। বর্তমানে জাল নোট প্রস্তুতকারী চক্রের নেতা। বাকি ৫ জন এসব নোট বিভিন্ন স্থানে চালানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিত। সেলিমকে দক্ষিণ মুগদার একটি বাসা থেকে একটি ল্যাপটপ, প্রিন্টার ও টাকা জাল করার সরঞ্জামাদিসহ গ্রেফতার করা হয়। সেলিমের বাসা থেকেই এক কোটি টাকার জাল টাকা উদ্ধার করা হয়। বাবুল নামে এক ইঞ্জিনিয়ারের কাছ থেকে সে জালটাকা তৈরি করার কলাকৌশল শিখেছে। কম্পিউটার সম্পর্কে তার তেমন কোন ধারণা না থাকলেও জাল টাকা তৈরি করতে তার কোন অসুবিধা হতো না। ইঞ্জিনিয়ার বাবুল বর্তমানে রংপুরে বসবাস করেন।
জাল টাকা প্রস্তুতকারী সেলিম সাংবাদিকদের জানায়, ঈদ সামনে রেখে বেশি পরিমাণে টাকা জাল করা হচ্ছিল। টাকা দুইভাবে নকল করা হয়। বাজার থেকে এক শ’ টাকার নোট সংগ্রহ করে সাবান দিয়ে পরিষ্কার করে ফেলা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিটি নতুন আসল এক শ’ টাকার নোট ১৩০ টাকায় কেনা হতো। এসব টাকা কেনা হতো গুলিস্তান নতুন টাকা বদলানোর দোকান থেকে। পরে পরিষ্কার করা এক শ’ টাকার নোটের ওপর পাঁচশ টাকার নোটের ছাপ দেয়া হয়। এতে এক শ‘ টাকার নোট মুহূর্তেই হয়ে যায় ৫শ’ টাকা। এসব নোট আবার বাজারে ছাড়া হয়। এসব নোট যে নকল তা বোঝার তেমন কোন কায়দা নেই। কারণ এক শ‘ টাকার নোটের আকৃতি আর ৫শ’ টাকার নোটের আকৃতি প্রায় একই। আসল কাগজ থাকায় অনায়াসে এসব নোট আসল বলে চালানো যায়। এক শ’ টাকার নোটের ওপর ৫শ’ টাকার ছাপ দিলে ধরা পড়ার কোন আশঙ্কা নেই।
দ্বিতীয় পদ্ধতিটি হচ্ছে, কাগজ কিনে তার ওপর এক হাজার টাকার নকশা ছাপানো। তবে তা পাঁচ শ’ টাকার নোটের মতো আসলের মতো হয় না। ফলে ধরা পড়ার আশঙ্কা থাকে। সেলিম আরও জানায়, দলের বাকি ৫ সদস্যের মাধ্যমে নকল টাকা বাজারে ছাড়া হতো। এক বছর ধরে সে জালটাকার কারবার চালিয়ে আসছিল। শহীদুল ও মরিয়ম সাংবাদিকদের বলে, সেলিমের কাছ থেকে জাল টাকা নিয়ে তারা বিভিন্নভাবে বাজারে ছাড়ত। এ জন্য তারা সেলিমের কাছ থেকে কমিশন পেত। রোজিনাও একইভাবে নকল টাকা বাজারে চালানোর কথা স্বীকার করে। রোজিনার স্বামী আব্দুল মান্নান ছিল জাল টাকার বড় পাইকার। স্বামীর অবর্তমানে নিজে জাল টাকার ব্যবসার হাল ধরে। স্বামীর মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে সে জাল টাকা প্রস্তুতকারী ও জাল টাকার খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পরিচিত হয়। গত একবছর ধরে রোজিনা এভাবেই জাল টাকার ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। জালাল জানায়, সপ্তাহে এক থেকে দেড় লাখ টাকার জাল টাকা দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করেছে সে। তবে দেশের অন্যান্য জেলার মধ্যে বরিশাল, রাজবাড়ী, সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার বিভিন্ন খুচরা বিক্রেতার কাছে জাল টাকা সরবরাহ করা হতো সবচেয়ে বেশি। প্রতি লাখ জাল টাকা সদস্যদের কাছে মাত্র ৮ থেকে ৯ হাজার টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে। আর মাঠ পর্যায়ে প্রতিলাখ জালটাকা ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে। শহিদুলের স্ত্রী মরিয়ম। তারা রোজিনার কাছ থেকে জাল টাকা খুচরাভাবে কিনে তা মিরপুরের বিভিন্ন মুদি দোকান, কাপড়ের দোকান ও কাঁচা বাজারে পণ্য সামগ্রীর মাধ্যমে চালাত।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রমজান ও ঈদ বাজারে জালটাকা ছড়িয়ে পড়ছে। বাজারে কেনাকাটার ভিড় থাকার সুযোগ কাজে লাগায় জালনোটের সঙ্গে জড়িতরা। তবে বড় সমস্যার কথা হচ্ছে ইতোমধ্যেই গ্রেফতার হওয়া প্রায় অর্ধশত জালনোট প্রস্তুতকারীর মধ্যে অন্তত ৩০ জনই জামিনে মুক্তি পেয়েছে। তারা রাজধানীতেই নতুন করে গড়ে তুলেছে জালনোট তৈরির একাধিক কারখানা। সে সব কারখানায় বিরতিহীনভাবে জালনোট তৈরি হচ্ছে। বাজারে চলে যাচ্ছে। গত বছরের শেষ দিকে বাজারে আচমকা ব্যাপকহারে জালনোট ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালায়। অভিযানে গত বছরই গ্রেফতার হয় ৩০ জন। গ্রেফতারকৃতরা গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, রাজধানীতে অন্তত ১৫টি জাল টাকা তৈরির কারখানা আছে। আর সারাদেশে অন্তত ২০টি জাল টাকা তৈরির কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় বিরতিহীনভাবে জালটাকা তৈরি হচ্ছে। গত বছরের শেষ নাগাদ এসব কারখানা থেকে অন্তত দেড় শ’ কোটি টাকার জাল নোট তৈরি হয়ে তা বাজারে চলে গেছে। পুলিশ রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে আবিষ্কার করে একাধিক জাল টাকা তৈরির কারখানা। কারখানাগুলো থেকে উদ্ধার হয় প্রায় এক শ’ কোটি টাকার তৈরিকৃত জালনোট। আর প্রায় ৫শ’ কোটি টাকার জালনোট তৈরির সরঞ্জামাদি।
গত বছরের শেষ নাগাদ জাল টাকায় বাজার সয়লাব হয়ে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক জালটাকা শনাক্ত করতে দেশের প্রতিটি কোরবানির পশুর হাটে জাল নোট শনাক্তকারী মেশিন বসিয়েছিল। জাল নোট শনাক্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরিং সেল রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য মতে, জাল টাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় গ্রামীণ অর্থনীতি। কারণ গ্রামের মানুষ জাল টাকায় প্রতারিত হন সবচেয়ে বেশি। গ্রামের মানুষজনের জাল টাকা সম্পর্কে ধারণাও কম। (The Daily Janakantha / 28 July)