ব্যবহারকারীর দেয়া রেটিং: / 0
খারাপউত্তম 

নিজেদের অর্থেই পদ্মা সেতু তৈরি করা হবে বলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর তার সম্ভাব্যতার বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে বিভিন্ন রকম কথাবার্তা শোনা গেছে এবং যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত বলেছেন, বাংলাদেশ তার নিজস্ব সম্পদ থেকে এ রকম তিনটি সেতু তৈরি করতে পারে। তিনি বলেছেন, দেশের অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালোটাকাসহ অন্যান্য উৎস ব্যবহার করা যেতে পারে। তিনি আরও বলেছেন, ‘আমাদের প্রযুক্তি আছে, বিশেষজ্ঞ আছে এবং সামর্থ্য আছে এমন প্রকল্প নির্মাণের।’ দেশের বিমা কোম্পানিগুলোর লাইফ ফান্ডের অলস ১১ হাজার কোটি টাকা এই সেতু নির্মাণে বিনিয়োগ করা সম্ভব বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ)। বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) এই প্রকল্পে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে খবরে প্রকাশ। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা তাঁদের বেতনের কিছু অংশ দেবেন বলে ইউনিয়নের নেতারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এসব থেকে অনেকের মনে এ রকম ধারণা জন্মাচ্ছে যে অর্থায়ন কোনো বড় রকমের বাধা নয়। এ ধরনের নির্মাণকাজের বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন প্রকৌশলী আইনুন নিশাতের বক্তব্য হলো: ‘এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিতে পারেন এমন বিশেষজ্ঞের অভাব নেই এ দেশে। কিন্তু আমাদের ঘাটতি রয়েছে অর্থে ও প্রযুক্তিতে। প্রযুক্তির বিষয়টি ঠিকাদারের মাথাব্যথা। সরকারের উচিত হবে সম্পূর্ণ অর্থ জোগাড়ের দিকে মনোযোগ দেওয়া। অর্থের সংস্থান হলেই কেবল নির্মাণকাজের ব্যাপারে অগ্রসর হওয়া।
অর্থায়নের বিষয়টি বোঝার জন্য প্রথমে মনে করা দরকার আসলে কী পরিমাণ অর্থ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এ কথা এখন সবারই জানা যে পদ্মা সেতুতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ২৯০ কোটি ডলার। ১২০ কোটি ডলার দেওয়ার কথা ছিল বিশ্বব্যাংকের। এ ছাড়া এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) দেওয়ার কথা ছিল ৬১ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) দেওয়ার কথা ছিল ৪০ কোটি মার্কিন ডলার, আর ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) দেওয়ার কথা ছিল ১৪ কোটি মার্কিন ডলার। বাকি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়ার কথা। প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ইতিমধ্যে সরে দাঁড়িয়েছে। জাইকার অবস্থান এখনো সুস্পষ্ট নয়। ফলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, নিজস্ব তহবিল থেকে সেতু করতে হলে এর পুরোটাই সরকারকে দেশের ভেতর থেকে সংস্থান করতে হবে। মনে রাখা দরকার, এখন যে ব্যয়ভার ধরা হয়েছে, শেষ পর্যন্ত সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে এমন সম্ভাবনা কম। কেননা এ প্রকল্পের পরিকল্পনা পর্যায়ে এই ব্যয়ভার কয়েক দফায় পুনর্বিন্যস্ত করতে হয়েছে। এ প্রকল্পের প্রথম ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৪০ কোটি ডলার। ২০০৭ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ১৪৭ কোটি ২৭ লাখ ডলারে প্রথম প্রকল্পটি অনুমোদন করেছিল। ২০০৯ সালের অক্টোবরে তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণে ব্যয় হবে ১৯০ কোটি মার্কিন ডলার। ডিসেম্বরে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত পদ্মা সেতুর অর্থায়নবিষয়ক আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, এ ব্রিজ নির্মাণে ব্যয় হবে ২৪০ কোটি মার্কিন ডলার। প্রধানমন্ত্রী তার ১০ দিনের মধ্যেই জানান, সেতু নির্মাণে ব্যয় হবে ২৬০ কোটি মার্কিন ডলার। এখন তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯০ কোটি ডলারে।
যেকোনো প্রকল্প তার পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নে যেতে যেতে ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ে। পদ্মা সেতু তার ব্যতিক্রম হয়নি। তদুপরি একে আরও বেশি ব্যবহারোপযোগী করতে, সাধারণ মানুষের জন্য আরও বেশি সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা করতে ব্যয় বাড়ানোর দরকার হয়েছে বলে অনুমান করতে পারি। এই বৃদ্ধি নিয়ে কোনো রকম প্রশ্ন ওঠেনি; তা থেকে এ-ও ধরে নিতে পারি যে স্বাভাবিক কারণেই সম্ভাব্য ব্যয়ের পরিমাণ বেড়েছে। নির্মাণকাজ শুরু হলে, বিশ্ববাজারে নির্মাণসামগ্রী বা জ্বালানির দাম বাড়লে ব্যয়ও বাড়বে—এমন অনুমান ভিত্তিহীন নয়। ফলে যেখান থেকেই অর্থ সংগ্রহ করা হোক, সেখান থেকে এই বাড়তি ব্যয় নির্বাহ করা যাবে—তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বিষয়ে যে পরিকল্পনা দিয়েছেন, তাতে অর্থায়নের কয়েকটি উৎসের কথা বলা হয়েছে। যেমন, উন্নয়ন বাজেট থেকে টাকা নেওয়া। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘চলতি বাজেটে ৫৫ হাজার কোটি টাকা উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দ আছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করেছি এবং এখান থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করতে পারি। উন্নয়ন বাজেটের এত বড় অংশ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে ব্যয় করলে অন্যান্য দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা রয়েছে কি না, সেটা অবশ্যই বিবেচ্য। বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেটের একটা বড় অংশ যেহেতু অবকাঠামো খাতে ব্যয় হয়, সেহেতু এর এত বড় অংশ সরিয়ে নিলে তার পরিণাম দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক হবে না। ২০১২-১৩-এর উন্নয়ন বাজেটের বড় খাতগুলোর মধ্যে আছে বিদ্যুৎ, সড়ক, রেলওয়ে, কৃষি, পানিসম্পদ উন্নয়নের মতো খাত, যেগুলো সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতিদিনের কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কোনো বিবেচনায়ই এসব খাতে ব্যয় হ্রাসের সিদ্ধান্ত খুব ইতিবাচক বলে মনে করার কারণ নেই।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় যেমন বলেছেন, ঠিক একইভাবে সংসদের স্পিকার, জেলা প্রশাসকেরা, এমনকি নাগরিকদের কোনো কোনো অংশ বলছেন, অর্থায়নের একটা বড় উপায় হলো সারচার্জ আরোপ করা। এ ক্ষেত্রে মোবাইল ফোনের প্রতি কলের ওপর সারচার্জের কথা সবচেয়ে সহজ বলে মনে করে অনেকে এ প্রস্তাবটা হাজির করেছেন। সারচার্জের বিষয়টি নিয়ে সবার মতামতের একটা অন্যতম কারণ হলো, এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা। রেল-বাস-লঞ্চের টিকিট, সিনেমার টিকিট এবং জমির নিবন্ধীকরণে সারচার্জ আরোপ করে বঙ্গবন্ধু সেতুর জন্য ৫০৮ কোটি টাকা সংগৃহীত হয়েছিল ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৪, ছয় বছর ধরে। এতে করে অনেকের ধারণা যে এই পদক্ষেপ নেওয়া সহজ। বঙ্গবন্ধু সেতুর জন্য অর্থের প্রয়োজন ছিল অনেক কম, তা সত্ত্বেও ছয় বছর ধরে এই ভার বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে বইতে হয়েছে। এর একটা বড় অংশ মধ্যবিত্তদের কাছ থেকে এসেছে বললে অতিরঞ্জন হবে না। সাধারণভাবে দ্রব্যমূল্যের যে ঊর্ধ্বগতি, জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বাড়ছে, তার সঙ্গে এই নতুন সারচার্জ একটা বোঝা হয়ে উঠবে, যার ভার আগের মতোই মধ্যবিত্তের কাঁধেই চাপবে।
এই পটভূমিকায় ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি) আয়োজিত এক সেমিনারে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ পরামর্শ দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও কৃষি খাতে ভর্তুকি ‘একটু কাটছাঁট’ করে বছরে তিন-চার হাজার কোটি টাকার সংস্থান করে তা পদ্মা সেতু নির্মাণে ব্যয় করার জন্য। তদুপরি তাঁর আশাবাদ, ‘প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে বন্ড ছেড়ে অনায়াসে পাঁচ-ছয় হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা যাবে।’ কৃষি খাতে ভর্তুকি হ্রাস করলে তার চাপ, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে কতটা ব্যাপক হবে, তা নিশ্চয় সবাই অনুমান করতে পারেন। প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০১০ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘গ্রামের ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। প্রায় ৩০ শতাংশ পরিবার শুধু কৃষির আয়ের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে’ (প্রথম আলো, ১৩ জুলাই ২০১২)। প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য যেসব সরকারি বন্ড এখন বাজারে আছে, সেগুলো হলো ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড, ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড এবং ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট। এ মাসের গোড়ায় এই বন্ডগুলো কেনার শর্ত শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এগুলোর অতীত পারফরম্যান্স থেকে এ ধরনের বন্ডের সম্ভাবনার ধারণা করা যেতে পারে। আমার জানামতে, এগুলো প্রবাসীদের কাছ থেকে খুব বেশি অর্থ আনতে পারেনি।
আরেকটি উৎসের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় তুলে ধরেছেন তা হলো সার্বভৌম বন্ড। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বিশ্ববাজারে ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের “সভরেন বন্ড” ছেড়েও অর্থ সংগ্রহ করা হবে।’ ৭৫০ মিলিয়ন অর্থাৎ ৭৫ কোটি ডলার—সভরেন বন্ডের এই পরিমাণ দেখে অনেকের ধারণা হতে পারে যে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এ ধরনের বন্ড বিক্রির কাজটি খুব সহজ এবং এভাবে অর্থ তুলতে পারলে বাংলাদেশকে আর কোনো বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হবে না। সভরেন বন্ড ছেড়ে বিশ্ববাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের বিষয়টি সরকার কিন্তু এই প্রথমবারের মতো বলল তা নয়, ২০১০ সালের শেষ থেকেই সরকার এ বিষয়ে বিবেচনা শুরু করে। কারণ, পদ্মা সেতু নয়, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি মেটানো। বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতির পেছনে সরকারের কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ প্রকল্পকে অনেকাংশেই দায়ী করা হয়ে থাকে। এই ঘাটতি মেটানোর জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বন্ড ছাড়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এ বছরের গোড়ায় সাত সদস্যের একটি কমিটি নিয়োগ করে, যাঁরা এপ্রিলে তাঁদের প্রতিবেদনে বন্ড ছাড়ার পক্ষে মত দেন, তবে এর বিভিন্ন রকমের ঝুঁকির কথাও মনে করিয়ে দেন। শেষাবধি মে মাসে সরকার এ সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসে। ওই সময় একটি সংবাদপত্রের কাছে সরকারি কর্মকর্তারা বলেন, ঝুঁকি বিষয়ে যথেষ্ট তথ্য তাঁদের কাছে নেই। ওই সময় বিআইডিএসের মহাপরিচালক এম কে মুজেরি বলেছিলেন, দেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলো এ ধরনের বন্ড ছাড়ার অনুকূল নয়। কোনো কোনো মহল, বিশেষ করে বিদেশি ব্যাংকের প্রতিনিধিরা বন্ড ছড়ার অনুকূলেই মত দেন।
এ ধরনের বন্ড বিক্রির সুফল-কুফল বোঝার জন্য গ্রিসবিষয়ক গত কয়েক মাসের খবরই যথেষ্ট, স্পেনের খবর যাঁরা রাখেন, তাঁরাও বলতে পারবেন। কিন্তু বিষয়টি আরও সহজ ও বোধগম্য করে লিখেছেন মোশাহিদা সুলতানা ঋতু। তাঁর এ লেখাটি বন্ড নিয়ে সরকারি বিবেচনার সময়ে লেখা (‘সার্বভৌম বন্ড: ঝুঁকি ও সম্ভাব্য পরিণতি বিশ্লেষণ’, মোশাহিদা সুলতানা, বিডিনিউজ২৪ডট কম, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১২)। সেখানে পদ্মা সেতুর অর্থায়নের উল্লেখ আছে। পদ্মা সেতুর অর্থায়নের প্রেক্ষাপটে যাঁরা, বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ যেসব ব্যক্তি, একে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের বিপরীতে একটি সমাধান হিসেবে ভাবছেন, তাঁদের জন্য মোশাহিদা সুলতানা ঋতুর লেখার প্রাসঙ্গিক একটা বক্তব্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। ‘বন্ড বিক্রি করার সময় শর্ত লেখা না থাকলেও নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রায় উচ্চ সুদে নেওয়া ঋণের সুদাসল পরিশোধের চাপ এবং ক্রেডিট রেটিংয়ের ওঠানামা—সেই একই শর্ত পূরণের ক্ষেত্রই তৈরি করবে। যেমন, ঋণের টাকায় বাংলাদেশ যদি এমন কোনো প্রজেক্ট হাতে নেয়, যার থেকে আয় সরকারি কোষাগারে জমা হতে সময় লাগবে পাঁচ বছর, তখন বাংলাদেশের জন্য এই টাকা প্রথম বছর থেকে নিয়মিত পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়বে এবং তখন অন্য খাতে ব্যয় কমিয়ে সেই টাকা পরিশোধ করতে হবে। এই সমস্যাকে বলা হয় ম্যাচিউরিটি মিসম্যাচ অর্থাৎ ম্যাচিউরিটির সময়ের ভিন্নতার কারণে উদ্ভূত ঝুঁকি। আবার সার্বভৌম বন্ড বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে এর চাহিদা ধরে রাখার জন্য সরকারকে জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় কমিয়ে সেই অর্থ লাভজনক খাতে ব্যয় করতে হবে। এ কারণেই দেখা গেছে, আর্জেন্টিনা ও গ্রিস সরকারকে খরচ কমাতে গিয়ে বেসরকারীকরণ ও জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় কমাতে বাধ্য করা হয়েছে। এ রকম পরিস্থিতিতে হয়তো পড়তে চায়নি গ্রিস বা আর্জেন্টিনা। কিন্তু বাস্তবতা এমন পর্যায়ে গেছে যে ঋণের বোঝা সামলাতে না পেরে এর দায় জনগণের ওপরই পড়েছে। কাজেই পরিণতির দিক থেকে বিশ্বব্যাংকের শর্ত আর বন্ড কিনলে বাজার ধরে রাখার শর্তের মধ্যে আসলে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। খোলা চোখে মনে হতে পারে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প সার্বভৌম বন্ড। কিন্তু বাস্তবে উভয়ের শর্ত একই।’ বাংলাদেশের জন্য এ ধরনের বন্ড বিক্রি করে ভবিষ্যৎ বন্ধক রাখার সিদ্ধান্ত কতটা সমীচীন, কতটা দূরদর্শী, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মতামত জানা খুবই দরকার।
দেশের ভেতর থেকে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে যেসব আলোচনা হচ্ছে, তার কয়েকটি প্রস্তাব বিষয়ে এযাবৎ তথ্যাদির ভিত্তিতে তৈরি এই রচনার লক্ষ্য, এ বিষয়ে আরও আলোচনার সূত্রপাত করা। রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক ধরনের কথাই বলা হচ্ছে। এসব আলোচনা অর্থনীতিবিদদের সমর্থন পাবে কি না, তা আদৌ বাস্তবায়ন সম্ভব কি না—এ বিষয়ে আরও অনেকের মতো আমারও কৌতূহল রয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের কথাবার্তায় এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে যেনতেনভাবে এখন এই প্রকল্পে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। কিন্তু এযাবৎ পাওয়া প্রস্তাবের সবগুলোই দাবি করে আরও তথ্য ও আলোচনা। অর্থায়ন বিষয়ে সরকার ও তার সমর্থকদের আলোচনার উদ্দেশ্য যদি হয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতির প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়া, তবে এ নিয়ে বাক্যবিস্তার নিরর্থক। কেননা, অর্থায়ন যেখান থেকেই হোক না কেন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই হবে।
ইলিনয়, ১২ জুলাই ২০১২
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক। (The Daily Prothom Alo / 16 July)