তরুণ সমাজের বেকারত্ব দূরহবে, তবে ইন্টারনেট ব্যয় কমাতে ও গতি বাড়াতে হবে
ফিরোজ মান্না ॥ বাংলাদেশের আউট সোর্সিংয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করার সম্ভাবনা রয়েছে। এই খাতে প্রতিবছর ৫শ’ কোটি টাকা আয় হতে পারে। বাংলাদেশের আউট সোর্সিং কর্মীদের দক্ষতা অন্য যে কোন দেশের সঙ্গে তুলনা করা যায়। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসে আউট সোর্সিং প্রতিষ্ঠান ওডেস্কের সহ-সভাপতি ম্যাট কুপার এমন কথা বলেছেন। আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে দেশের তরুণ সমাজের বেকারত্ব দূর করাও সম্ভব। তবে ইন্টারনেট ব্যয় কম এবং ইন্টারনেটের গতি সন্তোষজনক থাকতে হবে। আউট সোর্সিংয়ের মূল মাধ্যম হচ্ছে ইন্টারনেট। ইন্টারনেটের দাম না কমালে আউট সোর্সিংয়ে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের তরুণাই কাজ করতে পারবে। নিম্নবিত্তের তরুণরা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা ম্যাট কুপারের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তাঁরা বলেন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করলে এই সেক্টর থেকে আরও বেশি পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। ঘরে বসে থেকে একজন তরুণ ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে আয় করতে পারবে। সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে কিন্তু বাজেটে ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর শতকরা ১৫ ভাগ ভ্যাট আরোপ করেছে। এতে সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার কর্মসূচী বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে।
সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে সারাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি করার কোন বিকল্প নেই। কিন্তু ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর শতকরা ১৫ ভাগ কর থাকায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের যে মূল্য পরিশোধ করতে হয় তা অন্য সব দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এ উচ্চমূল্য কমাতে অবিলম্বে ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর থেকে ধার্য ১৫ ভাগ কর প্রত্যাহার করা জরুরী বলে মনে করে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বেসিস)। কারণ এই করের কারণে কম্পিউটার পণ্য মূল্যের দাম অনেক বেড়ে যাবে। এতে ব্যবহারকারীদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। নিম্নবিত্তের জন্য এই কর আরও বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব) জিয়া আহমেদ বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে দেশ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। বিশেষ করে এই সেক্টরে মেয়েরাও অনেক ভাল করছে। সারাদেশ নেটওয়ার্কের আওতায় চলে এসেছে। ইতোমধ্যে ৯ কোটি মানুষ মোবাইল ব্যবহার করছে। ৩ কোটি মানুষের বেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করেছে। দিন যত যাচ্ছে মোবাইলের মতো ইন্টারনেটের ব্যবহারও বাড়ছে। এই সেক্টরে ১৫ লাখের বেশি লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। গ্রামপর্যায়ে ইন্টারনেট নিয়ে যাওয়ার জন্য ওয়্যারলেস ইন্টারনেট এবং মোবাইল অপারেটরদের মাধ্যমে কাজ শুরু হয়েছে অনেক আগেই। তাছাড়া ইন্টারনেট এখন অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দেশের মানুষ যত বেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করবে তত বেশি দক্ষ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে তরুণ সমাজ ইন্টারনেটের মাধ্যমে এখন বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। তাদের আরও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হলে ইন্টারনেট সুবিধা আরও বাড়াতে হবে।
বিটিআরসি সূত্র জানিয়েছে, থ্রিজি লাইসেন্স দেয়ার পর দেশে এই সেক্টরে বড় বিপ্লব ঘটে যাবে। থ্রিজি প্রযুক্তির মাধ্যমে উচ্চগতিতে তথ্য পরিবহন সম্ভব হওয়ায় মোবাইল ফোনেই টিভি দেখা, জিপিএসের মাধমে পথনির্দেশনা পাওয়া, উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহারসহ ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেয়া সম্ভব হবে। থ্রিজির পরের ধাপের প্রযুক্তি হচ্ছে ফোরজি। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য ফোরজিকেই লং টার্ম ইভাল্যুশন (এলটিই) বলছেন। এলটিই প্রযুক্তিতে থ্রিজির চেয়েও বেশি গতিতে তথ্য আদান-প্রদান করা যায়। আধুনিক প্রযুক্তির এই ফোনে একজন অন্যজনকে দেখে কথাও বলতে পারবেন, এমনকি ভিডিও কনফারেন্সও করা যাবে। এছাড়া ইন্টারনেট ব্রাউজিং, মোবাইল টিভি দেখা, ভিডিও কনফারেন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা সম্ভব হবে। থার্ড জেনারেশন (থ্রিজি) ফোন চালু হলে প্রাহক বিশ্বকে পেয়ে যাবে হাতের মুঠোয়।
সূত্র জানিয়েছে, বিশ্বের তরুণ সমাজের কাছে স্বাধীন, সম্মানজনক দক্ষতানির্ভর চাকরি মানেই আউট সোর্সিং। এ বিষয়টি দেশের তরুণ সমাজের মধ্যেও বিরাজ করছে। দেশে বেকারত্বের হার বাড়ছেই। তরুণদের হতাশা কাজ করছে। কিন্তু মেধাবী তরুণদের মধ্যে আউট সোর্সিং আয়ের বড় একটি জায়গা হয়ে উঠেছে। তারা এখন ঘরে বসেই অনেক টাকা আয় করছে। তবে অবকাঠামোগত সুবিধা-অসুবিধাগুলো রয়েছে। ইন্টারনেটের গতি এবং প্রতি এমবিপিএসের দাম উচ্চ মূল্যে শোধ করতে হচ্ছে। সব চেয়ে বড় অসুবিধার হচ্ছে বিদ্যুত। বিদ্যুতের লুকোচুরির খেলায় আউট সোর্সিং কাজ করা তরুণরা হাঁপিয়ে উঠেছে। ব্যাকআপের কোন ব্যবস্থা নেই।
ম্যাট কুপার বলেন, বাংলাদেশ আইসিটি খাতে দারুণভাবে এগিয়ে গেছে। এ দেশের ৭০ ভাগ প্রজন্মই তারুণ্যনির্ভর। তাই জনসংখ্যা এদেশের জন্য সমস্যা নয়, বরং সম্পদ। তবে সুদক্ষ আর পেশাভিত্তিক দক্ষতা ছাড়া এ সমস্যা জাতীয় সম্পদ হিসেবে কাজে আসবে না। এজন্য সরকারকে প্রণোদনা প্যাকেজের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের তরুণরা ওডেস্কের তালিকায় নিজেদের শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করেছে। বর্তমান সময়ে পুরো বিশ্বেই আউট সোর্সিং নির্ভরতা বাড়ছে। স্থির অফিসের তুলনায় এখন চলমান (ভার্চুয়াল) অফিস পদ্ধতিই জনপ্রিয় হচ্ছে। আর বাংলাদেশে এ কাজের জন্য চমৎকার পরিবেশ আছে। এ খাতে সুনির্দিষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন রয়েছে। এই সুবিধা তাদের দিতে পারলেই যে কোন অর্জনই সহজ হয়ে যাবে। বাংলাদেশ গত ৩ বছরে আউট সোর্সিংয়ে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে তুলে ধরেছে। বিশ্বের কোন দেশই এখন আউট সোর্সিংয়ে বাংলাদেশকে খাটো করে দেখে না, বরং সর্বোচ্চ বিবেচনায় নিয়েছে।
বিশ্বব্যাপী আউট সোর্সিংয়ের অর্ধেক বাজারই এখন ওডেস্কের দখলে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ এ কাজের জন্য সবেচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। আর সাফল্যটাও নিঃসন্দেহে ঈর্ষণীয়। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম আউট সোর্সিংবান্ধব। কিছু সীমাবদ্ধতা আর অদক্ষতা যে একেবারে নেই তা নয়। তবে তা কাটিয়ে ওঠা খুবই সম্ভব। বাংলানিউজে ম্যাট কুপার এক সাক্ষাতকারে বলেন, বাংলাদেশের জন্য অনলাইন অর্থনীতিতে গবেষণা এবং উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ‘সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন’ (এসইও) খাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। তবে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা তরুণ সমাজ দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পারবে। আউট সোর্সিং চাকরিতে আরও সুদক্ষ জায়গায় বাংলাদেশের তরুণদের প্রবেশ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের আউট সোর্সিং কন্ট্রাকটররা ঘণ্টায় ন্যূনতম ১৫ থেকে ২০ ডলার আয় করে। বাংলাদেশে কন্ট্রাকটররা ঘণ্টায় ন্যূনতম ৫ থেকে ১০ ডলার আয় করছে। আয় বাড়াতে হলে তাদের আরও বেশি পরিশ্রমী হতে হবে। নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বর্তমান আউট সোর্সিং বাজারে দ্বিগুণ দখলে আসবে। এ বিশাল বাজার পেতে অনেক আউট সোর্সিং প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। (The Daily Janakantha / 23 June)




