বাংলা ভাষার চর্চা নিয়ে মাতৃভাষার মাসে যে ঘটা করে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়, তা হয়ে থাকে বাঙালীর অন্তরের তাগিদ থেকেই। অনেকে এ বিষয়টাকে অন্যভাবে দেখে এসব কর্মকা-কে মৌসুমি কর্মকা- বলে উপহাস করে থাকেন। অর্থাৎ এগুলোর গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা তাদের কাছে নিতান্তই নগণ্য। বাংলা ভাষার আলোচনা পর্যালোচনা শুধু ভাষার মাসে নয়, সব মাসেই সব সময়েই হওয়া প্রয়োজন। কারণ যে দেশে প্রচারমাধ্যমে বাংলার বিকৃত উচ্চারণকে কোর্ট-নির্দেশের মাধ্যমে বন্ধ করতে হয়, সে দেশে ভাষা যে অন্যভাবে দূষিত হচ্ছে না তা কে বলতে পারে?
এ নিবন্ধের আলোচ্য বিষয়ের ওপর আলোকপাত করার আগে কিছু শব্দের ধাতুগত অর্থ বর্জন করে অন্য অর্থ গ্রহণের বিষয়ে একটা গৌরচন্দ্রিকার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। বাংলা ভাষায় অনেক শব্দ রয়েছে যেগুলোর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ এবং প্রচলিত অর্থ এক নয়। এসব শব্দের কোনটি রূঢ়ি আবার কোনটিকে (সমাসবদ্ধ) যোগরূঢ় শব্দ বলা হয়। এসব শব্দ ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হারিয়ে কেন অন্য অর্থ গ্রহণ করেছে তার কারণ বা ইতিহাস সব শব্দ সম্পর্কে জানা না থাকলেও কিছু কিছু শব্দের ইতিহাস অনেকেরই জানা। যেমন গবাক্ষ, দুহিতা, সন্দেশ, গবেষণা, গোধূলি, মন্ত্রণালয় প্রভৃতি। গবাক্ষ অর্থ গরুর চোখ কিন্তু প্রচলিত অর্থ জানালা। দুহিতা অর্থ-দোহনকারিণী কিন্তু প্রচলিত অর্থ কন্যা। সন্দেশ অর্থ সংবাদ কিন্তু প্রচলিত অর্থ মিষ্টি বিশেষ। গবেষণা অর্থ গরুখোঁজা কিন্তু প্রচলিত অর্থ বিশেষভাবে অনুসন্ধান। গোধূলি অর্থ গরুর পায়ের ধুলা, কিন্তু প্রচলিত অর্থ সূর্যাস্ত সময়। মন্ত্রণালয় অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত আলয় বা ভবন কিন্তু প্রচলিত অর্থ মন্ত্রীদের দফতর। এ ধরনের শব্দের নিজস্ব অর্থ হারিয়ে নতুন অর্থ গ্রহণের ব্যাপারে বাঙালীর অতীত জীবনযাত্রা, সমাজব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক কারণ অনেকাংশে দায়ী। এসব শব্দের ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গেলে বৃহৎ পরিসরের প্রয়োজন। তাই সংক্ষেপে দু’চারটের কথা বলা যেতে পারে।
(১) অতীতে বাংলার মানুষের পর্ণকুটিরের জানালা গরুর চোখের মতই গোল করে কাটা হতো। এ কারণেই জানালাকে গরুর চোখ বা গবাক্ষ বলে অভিহিত করা শুরু হয়।
(২) গো-পালন প্রতিটি গৃহস্থের প্রধান কাজ হওয়ায় তার আনুষঙ্গিক কাজ হিসেবে গাভী দোহন ছিল নৈমিত্তিক ব্যাপার। আর এ কাজটা করত গৃহস্থের কন্যারাই। তাই কন্যারা দোহনকারিণী বা দুহিতা নামে অভিহিত হতে লাগল।
(৩) দূর-দূরান্তের আত্মীয় বাড়িতে সংবাদ প্রেরণের একমাত্র উপায় ছিল লোক পাঠানো। সংবাদ বাহকের সঙ্গে মিষ্টি পাঠানোটাও অবধারিত হয়ে উঠেছিল। সেক্ষেত্রে আত্মীয় বাড়ির ছোটদের কাছে সংবাদের চেয়ে মিষ্টির গুরুত্ব বেশি পেত। তাই তো তারা খুশি হয়ে মিষ্টিকেই লক্ষ্য করে সন্দেশ এসেছে বলে আনন্দ করত। ফলে সন্দেশ আর খবর থাকল নাÑ মিষ্টিতে পরিণত হয়ে গেল।
(৪) রাখাল গরুর পাল নিয়ে ঘরে ফিরে যখন দেখতে পেত গরু নেই তখন তা খুঁজে পেতে তাকে খুবই কষ্ট পেতে হতো। তাই যে কোন কষ্টকর অনুসন্ধানমূলক কাজকে গরুখোঁজার সঙ্গে তুলনা করে সেটাকে গরুখোঁজা বা গবেষণা নামে অভিহিত করা শুরু হলো।
(৫) রাখালরা সূর্যাস্তের সময় গরুর পাল নিয়ে যখন বাড়ি ফিরত তখন গরুর পায়ের ধুলায় চারদিক অন্ধকার হয়ে যেত। আর প্রতিদিন একই সময়ে গরু নিয়ে ফেরার কারণে ওই সময়টাকে গোধূলি সময় বলে অভিহিত করতে লাগল।
(৬) বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ‘মন্ত্রণালয়’ শব্দটিকে ইংরেজী মিনিস্ট্রি শব্দের পরিশব্দ বা পারিভাষিক শব্দ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। যদিও এ শব্দ মন্ত্রক বা মন্ত্রণার সুনির্দিষ্ট আলয় বা ভবনকে বুঝায় না। সে কারণেই এ শব্দটিও নিজের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হারিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে নতুন অর্থ গ্রহণ করেছে। তাই এটিকে রূঢ়ি শব্দ বলা যায়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়াও যে রাজনৈতিক কারণে অনেক শব্দ নিজস্ব অর্থ হারিয়ে অন্য বিশেষ অর্থ গ্রহণ করতে পারে তার উদাহরণÑমীরজাফর ও রাজাকার শব্দ দুটি।
একইভাবে আর একটি বাংলা শব্দের ব্যবহার অনেকেরই দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। তা হচ্ছে ‘জনক’ শব্দ। ‘জনক’ শব্দটি রাজনৈতিকভাবে বেশি বেশি ব্যবহারের ফলে শব্দটি অনেক মর্যাদার আসন পেতে চলছে। ভবিষ্যতে হয়ত এ শব্দটিও রূঢ়ি শব্দে পরিণত হয়ে যাবে। জাতির পিতাকে জনক বলে ওই শব্দটার শুধু অপব্যবহারই নয়, জাতির পিতাকেও যেন বিদ্রƒপ করা হচ্ছে। কারণ জনক শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হচ্ছে জনেন্দ্রিয়ের সাহায্যে যারা জন্মদান করেন কেবল তাঁরাই জনক-জননী বলে অভিহিত হতে পারেন। অতএব জাতির পিতাকে জাতির জনক বলা অসঙ্গত এবং জনক শব্দের অপব্যবহার। এ ব্যাপারে সরকারীভাবে নিষেধাজ্ঞা আসা উচিত বলে মনে করি। এ ধরনের শব্দের মধ্যে আমরা রমণী এবং কামিনী শব্দ দুটির ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিবেচনায় রাখার পক্ষপাতী। কারণ রমণ শব্দের সঙ্গে রমণী এবং কাম শব্দের সঙ্গে কামিনী শব্দ সম্পর্কযুক্ত। অতএব আমরা বলতে পারি না যে, আমার মা একজন বিদুষী রমণী ছিলেন।
এছাড়া বর্তমান সময়ে যা লক্ষণীয় তা হচ্ছে ‘সনদপত্রে’র ব্যবহার। ‘সনদপত্র’ শব্দটাকে সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান নির্বিচারে ব্যবহার করে চলছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের অধীনে যেসব বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ শিক্ষকরা গ্রহণ করেছেন, সেসব প্রশিক্ষণের সব সার্টিফিকেটই ‘সনদপত্র’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ এ ব্যবহার ব্যাকরণগতভাবে ভুল। ‘সনদ’ শব্দটি বিশেষ্য এবং আরবি শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে উপাধিপত্র বা প্রজ্ঞাপত্রÑইংরেজীতে যাকে বলে সার্টিফিকেট। শুধু সনদ শব্দ দ্বারাই উপাধিপত্র বা সার্টিফিকেট অর্থ প্রকাশ পায়। অনুরূপ শব্দ যেমন ‘ফরমান’ শব্দ এটিও বিশেষ্য এবং ফারসি শব্দ। এর অর্থ হুকুমনামা বা আদেশপত্র। আমরা যেমন আদেশপত্রের অনুকরণে ফরমানপত্র বলতে পারি না, তেমনি উপাধিপত্র বা প্রশংসাপত্রের অনুকরণে সনদপত্রও লিখতে পারি না। শুধু সনদ লিখলেই সঠিক হবে।
ফরমান এবং সনদ শব্দসহ অনেক বিদেশী শব্দ অনেক আগেই রাজনৈতিক কারণে প্রশাসনিক কাজে ব্যবহারের জন্য বাংলা ভাষায় স্থান করে নিয়েছে এবং সেগুলো সুনির্দিষ্ট অর্থ প্রকাশ করে আসছে। সেসব অর্থকে অগ্রাহ্য করে আগেপিছে কিছু শব্দ যোগ করে এগুলোকে নবসৃষ্ট শব্দ বলে চালিয়ে দেয়ারও কোন সুযোগ নেই। তাই এসব ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত। তবে অনেক সময় ভ্রান্তিবশত আমরা অনেক কিছুই বলি বা অনেক কিছুই লিখি। সরোজ, মনোজ, জলজ, বনজ শব্দকে অনুকরণ করে যেমন অনেকে ‘ফলজ’ (বৃক্ষ) শব্দটি উচ্চারণ করেন বা লিখে থাকেন তেমনি হয়ত ‘সনদপত্র’ শব্দটিও লেখা হয়ে থাকতে পারে।
রাজনৈতিক কারণে যে ভাষার পরিবর্তন, নতুন শব্দের প্রচলন প্রভৃতি হতে পারে সে কথা অনস্বীকার্য। তাই বলে অশুদ্ধ শব্দের প্রচলন বা শব্দের অপপ্রয়োগ করে ভাষার আভিজাত্য নষ্ট হয়ে যাক সেটা কারোরই কাম্য হওয়া উচিত নয়। যদিও সে ব্যাপারে সাধারণ মানুষের কারোরই কিছু করার নেই। ভাষা বিজ্ঞানী হায়াত মামুদ বলেছেন, “শব্দ পাল্টায়Ñমরে যায়, ঠিক; কিন্তু মনে রাখা একান্ত জরুরী যে, এসব আমাদেরÑযারা ভাষাটি ব্যবহার করছি তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছার কারণে হয় না। সমাজের চলন, রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতির গতি, কৃষি বা কলকারখানার উৎপাদন, নানা সংস্কৃতির মানুষজনের সঙ্গে মেলামেশা, রেডিও শোনা, টেলিভিশন দেখা ইত্যাদি অজস্র ব্যাপার অতিশয় ধীরলয়ে এই পরিবর্তনের কা-কারখানা ঘটায়। আমাদের চোখে অবশ্য পড়েÑ ঘটে যাওয়ার অনেক পরে।’
আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, যেসব বিদেশী শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবেশ করে তাদের নিজ জায়গা পাকাপোক্ত করে ফেলেছে সেসব শব্দকে আমরা যে চোখেই দেখি না কেন সেগুলোকে আর প্রত্যাখ্যান করা সহজ হবে না এবং তারা যে অর্থ বহন করে চলছে তার ব্যত্যয় ঘটানোরও কোন উপায় নেই। আর এসব বিদেশী শব্দের বাংলা পারিভাষিক শব্দ কখন কীভাবে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে তা সময়ই বলে দেবে। ‘পুলিশ’ শব্দ যদি আবালবৃদ্ধের কাছে বিশেষ পরিচিত লাভ করে থাকে তাহলে পুলিশের পরিশব্দ ‘আরক্ষণ’ চলবে কী করে? ভেটো (ঠবঃড়) শব্দটাকে তো সবাই চিনে ফেলেছে, তাহলে তার পরিশব্দ-‘প্রতিষেধ’ কি কেউ গ্রহণ করবে? মোবাইল ফোনকে যতই মুঠোফোন বলবার চেষ্টা করি না কেন, ছেলে বুড়ো সবার মুখেই ‘মোবাইল ফোন’। স্কুল, কলেজ হেডমাস্টার, প্রিন্সিপালের মতো যদিও রেডিও-টেলিভিশন, কম্পিউটার-ইন্টারনেট-নেটওয়ার্ক প্রভৃতি শব্দও বাঙালী বনে যায় তাতে দোষ কী? একই সঙ্গে আমাদের ভাষায় যে অসংখ্য তাৎপর্যপূর্ণ শব্দ রয়েছে যেগুলো আমাদের ভাষার আভিজাত্যকে তুলে ধরছে, সেসব সম্পর্কেও আমাদের সঠিক ধারণা থাকা দরকার এবং সেসব শব্দের সঠিক ব্যবহার করে ভাষাকে নিষ্কলুষ রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক (The Daily Janakantha / 20 June)
-------------------------
|
For Domain registration, Web Hosting, Design, Joomla or Wordpress, E-Commerce, Open Source CMS, Custom Design, E-Mail. Please Contact: +966 593397787 | E-Mail- shah@gopalgonj.net |




